আগুনের
মুখে বই...
ফ্যাসিবাদ, সেন্সরশিপ ও স্মৃতি মুছে ফেলার রাজনীতি
একটি বই পোড়ানো মানে কেবল
কিছু কাগজ পুড়িয়ে ফেলা নয়। তার সঙ্গে পুড়ে যেতে পারে কোনও মানুষের চিন্তা, কোনও সমাজের স্মৃতি,
কোনও
জাতির আত্মসমালোচনার ক্ষমতা। ইতিহাসে যখনই কোনও কর্তৃত্ববাদী শাসন নিজের মতাদর্শকে
একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে,
তখনই
তার অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে জ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প ও স্বাধীন চিন্তার জগৎ। কখনও রাষ্ট্রের নির্দেশে, কখনও উন্মত্ত জনতার হাতে, কখনও আবার সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের উদ্যোগে বইয়ের উপর নেমে এসেছে আগুন। সেই
আগুনের শিখায় দেখা যায় ফ্যাসিবাদের এক পরিচিত মুখ— যে মুখ শুধু বিরোধী কণ্ঠকে
স্তব্ধ করতে চায় না, মানুষের কল্পনা করার
স্বাধীনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
বই পোড়ানোর ইতিহাস অবশ্য ফ্যাসিবাদের জন্মের বহু আগের। প্রাচীন পৃথিবী থেকে ধর্মীয় সংঘাত, সাম্রাজ্য বিস্তার, ঔপনিবেশিক শাসন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের নানা পর্বে বই ও পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক ফ্যাসিবাদ বই পোড়ানোকে যে রাজনৈতিক অর্থ দিয়েছে, তার বিশেষত্ব হল— এটি কেবল কোনও একটি বইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; বরং কোন জ্ঞান গ্রহণযোগ্য, কোন ইতিহাস স্মরণীয়, কোন মানুষ সমাজের অংশ এবং কোন চিন্তার অস্তিত্বের অধিকার থাকবে, তা নির্ধারণ করার চেষ্টা। অর্থাৎ বই পোড়ানো হয়ে ওঠে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক শুদ্ধিকরণ প্রকল্পের দৃশ্যমান প্রতীক।
বার্লিনের আগুন: নাৎসি
জার্মানির সাংস্কৃতিক শুদ্ধি
১৯৩৩ সালের ১০ মে। বার্লিনের
অপের্নপ্লাৎসে (বর্তমান বেবেলপ্লাৎস) রাতের অন্ধকারে জ্বলে উঠেছিল বিশাল
অগ্নিকুণ্ড। আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল হাজার হাজার বই। জার্মানির বিভিন্ন
বিশ্ববিদ্যালয় শহরে ছাত্রদের নেতৃত্বে আয়োজিত হয়েছিল এমন বই পোড়ানোর অনুষ্ঠান। এর পিছনে
ছিল নাৎসি ছাত্র সংগঠন, আর তার রাজনৈতিক আবহ
তৈরি করেছিল সদ্য ক্ষমতায় আসা অ্যাডলফ হিটলারের সরকার।
যে বইগুলি পোড়ানো হয়েছিল, সেগুলি কোনও একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা লেখকের মধ্যে সীমাবদ্ধ
ছিল না। ইহুদি লেখক, সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট, শান্তিবাদী, উদারপন্থী এবং নাৎসি মতাদর্শের বিরোধী বহু লেখকের রচনা এই
আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিল। হাইনরিখ হাইনে,
কার্ল
মার্ক্স, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, এরিখ মারিয়া রেমার্ক এবং বহু বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তকের বই
নাৎসি সাংস্কৃতিক রাজনীতির আওতায় নিষিদ্ধ বা ধ্বংসের শিকার হয়। প্রায় একশো বছর আগে
হাইনে লিখেছিলেন, ভাবার্থে, যেখানে বই পোড়ানো হয়,
সেখানে
শেষ পর্যন্ত মানুষও পোড়ানো হতে পারে। কথাটি তাঁর নাটক Almansor-এ বলা হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে, অন্য এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। ১৯৩৩ সালের জার্মানিতে সেই
সতর্কবাণী যেন ভয়াবহ বাস্তবতার পূর্বাভাস হয়ে উঠেছিল।
নাৎসিদের কাছে বই পোড়ানো ছিল
একটি প্রতীকী ঘোষণা: জার্মান সংস্কৃতি কেমন হবে, তার সিদ্ধান্ত নেবে রাষ্ট্রসমর্থিত মতাদর্শ। যে সাহিত্য মানুষের স্বাধীনতা, যৌনতা, শ্রেণিবৈষম্য, যুদ্ধবিরোধিতা কিংবা জাতিগত সমতার কথা বলে, তাকে তারা ‘অজার্মান’ বলে চিহ্নিত করেছিল। এই ভাষার মধ্যেই
লুকিয়ে ছিল বিপজ্জনক একটি ধারণা— রাষ্ট্রের নির্ধারিত পরিচয়ের বাইরে থাকা মানুষ ও
চিন্তা যেন জাতির শরীরে অনুপ্রবেশ করা কোনও দূষণ।
কিন্তু বই পোড়ানোর আগেই শুরু
হয়েছিল লেখকদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা,
প্রকাশনা
নিয়ন্ত্রণ, গ্রন্থাগার থেকে বই সরিয়ে
দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে নাৎসিকরণের প্রক্রিয়া। পরবর্তী
সময়ে ইহুদি ও অন্যান্য নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, নির্বাসন, বন্দিশিবির এবং
গণহত্যার সঙ্গে এই সাংস্কৃতিক নিপীড়নের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বইয়ের আগুন
এবং মানুষের উপর নেমে আসা আগুন এক ঘটনা নয়;
কিন্তু
উভয়ের পিছনে কাজ করেছিল মানুষকে তার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থেকে বঞ্চিত করার এক ভয়াবহ
রাজনীতি।
মুসোলিনির ইতালি: আগুনের চেয়ে কার্যকর নীরবতা
ফ্যাসিবাদের ইতিহাসে বই
পোড়ানোর সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য জার্মানির হলেও,
ইতালিতে
বেনিতো মুসোলিনির শাসন দেখিয়েছিল— প্রতিটি বইকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হয় না; অনেক সময় বইয়ের কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়াই যথেষ্ট। ১৯২২ সালে
ক্ষমতায় আসার পর মুসোলিনি ধীরে ধীরে ইতালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক
প্রতিষ্ঠানগুলিকে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের অধীনস্থ করে তোলেন। সংবাদমাধ্যমের উপর
নিয়ন্ত্রণ, প্রকাশনার ক্ষেত্রে
হস্তক্ষেপ, লেখকদের উপর চাপ এবং বিরোধী
মতাদর্শের প্রচার সীমিত করার মধ্য দিয়ে সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার পরিসর সংকুচিত হতে
থাকে। ১৯২০-এর দশকের শেষ ভাগ থেকে শুরু হওয়া বই-নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ত্রিশের দশকে
আরও কঠোর হয়।
ইতালির অভিজ্ঞতা তাই একটি
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: ফ্যাসিবাদ কি শুধুই প্রকাশ্য হিংসার মাধ্যমে
সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে, নাকি সংস্কৃতির ভিতরেই
নিজের অনুগত এক ব্যবস্থা তৈরি করে? মুসোলিনির ইতালিতে
দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখক কী লিখবেন, প্রকাশক কী ছাপবেন,
সংবাদপত্র
কোন খবরকে গুরুত্ব দেবে, স্কুলে কোন ইতিহাস
পড়ানো হবে— এই সমস্ত সিদ্ধান্তের উপর রাষ্ট্রের প্রভাব বাড়তে থাকে। এখানে বই
পোড়ানোর সংস্কৃতি আরও গভীর অর্থ পায়। কারণ বইয়ের শারীরিক অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেও
তার বক্তব্যকে নিষ্ক্রিয় করা যায়। কোনও লেখককে প্রকাশের সুযোগ না দেওয়া, কোনও বইকে পাঠকের নাগালের বাইরে সরিয়ে রাখা কিংবা একটি
নির্দিষ্ট মতাদর্শের বইকে সর্বত্র প্রচার করে বিকল্প চিন্তাকে কোণঠাসা করা— এসবও
সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উপায়। ফ্যাসিবাদ কেবল বিরোধী বইকে ভয় পায় না। সে
এমন এক সমাজ চায়, যেখানে মানুষ বিরোধী
বইয়ের প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করবে না; যেখানে রাষ্ট্রের
ভাষাই মানুষের নিজের ভাষা হয়ে উঠবে।
স্পেন: গৃহযুদ্ধ, ফ্রাঙ্কোর শাসন ও ইতিহাসের উপর কর্তৃত্ব
১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের
স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুধু ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই ছিল না; তা ছিল স্পেনের ভবিষ্যৎ পরিচয় নিয়েও সংঘর্ষ। জেনারেল
ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী বাহিনীর বিজয়ের পর প্রতিষ্ঠিত
স্বৈরশাসনে সেন্সরশিপ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং
সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। এখানে একটি ঐতিহাসিক পার্থক্য মনে রাখা
জরুরি: ফ্রাঙ্কোর শাসনকে প্রায়ই ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর
কর্তৃত্ববাদী ডানপন্থী ঐতিহ্যের মধ্যে আলোচনা করা হয়, যদিও তার রাজনৈতিক কাঠামো নাৎসি জার্মানি বা মুসোলিনির
ইতালির মতো ছিল না। তবু বিরোধী মতাদর্শকে দমন করা, শিক্ষাব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের পছন্দসই জাতীয়
ইতিহাসকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য ছিল।
স্পেনের এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, কোনও শাসন বইয়ের প্রতিটি কপি ধ্বংস না করেও একটি সমাজের স্মৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিছু ঘটনা আলোচনার বাইরে চলে যায়, কিছু লেখক পাঠ্যক্রম থেকে হারিয়ে যান, কিছু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছয় না। তখন সেন্সরশিপ আর কেবল প্রকাশনার সমস্যা থাকে না; তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি। কোনও জাতি তার অতীতের সব অধ্যায় নিয়ে স্বাধীনভাবে আলোচনা করতে না পারলে, সেই জাতির বর্তমানও অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে। কারণ ইতিহাসকে প্রশ্ন করার অধিকার হারালে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ভাষাও দুর্বল হয়ে যায়।
চিলি ও আর্জেন্তিনা:
স্বৈরশাসনের আগুনে নিষিদ্ধ জ্ঞান
ইউরোপের বাইরে লাতিন
আমেরিকাতেও বই ধ্বংস ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের ইতিহাস রয়েছে। তবে এই দেশগুলির
ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। চিলিতে অগুস্তো পিনোশে
এবং আর্জেন্তিনায় ১৯৭৬–১৯৮৩ সালের সামরিক শাসন ছিল কর্তৃত্ববাদী সামরিক শাসন। তাদের প্রত্যেককে সরাসরি ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের
সমতুল্য বলা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়। কিন্তু বই নিষিদ্ধ করা, বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তা দমন এবং রাষ্ট্রের নির্ধারিত
আদর্শের বাইরে থাকা মানুষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এই শাসনগুলির
সঙ্গে ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক রাজনীতির উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়।
১৯৭৩ সালের সামরিক
অভ্যুত্থানের পর চিলিতে সেন্সরশিপ ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন তীব্র হয়ে ওঠে। বামপন্থী, মার্কসবাদী এবং শাসনবিরোধী বলে বিবেচিত সাহিত্য ও প্রকাশনা
সন্দেহের চোখে দেখা হতো। বইয়ের বিষয়বস্তুকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি করে তোলার
ফলে পাঠাগার, প্রকাশনা এবং স্বাধীন
জ্ঞানচর্চার পরিসর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর্জেন্তিনার সামরিক শাসনে বই পোড়ানোর ঘটনা আরও
প্রত্যক্ষভাবে নথিবদ্ধ রয়েছে। ১৯৮০ সালে সারান্দি এলাকায় Centro Editor de América Latina প্রকাশনা সংস্থার বই ধ্বংসের
একটি ঐতিহাসিক আলোকচিত্র আর্জেন্তিনার জাতীয় স্মৃতি-সংরক্ষণাগারভিত্তিক নথিতে
সংরক্ষিত আছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রায় ১৫ লক্ষ বই পোড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক বই ধ্বংসের
তাৎপর্য শুধু পরিসংখ্যানে নয়। বইয়ের মধ্যে ছিল এমন চিন্তা, সাহিত্য ও জ্ঞানের সম্ভাবনা, যা শাসকের নির্ধারিত রাজনৈতিক সীমার বাইরে যেতে পারত। ফলে বইয়ের উপর আক্রমণ
আসলে পাঠকের স্বাধীন বিচারবুদ্ধির উপরও আক্রমণ। যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিককে
স্বাধীনভাবে পড়তে দিতে ভয় পায়, সে রাষ্ট্রের কাছে
বই হয়ে ওঠে একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। কারণ একটি বই পাঠককে এমন প্রশ্ন
শেখাতে পারে, যা রাষ্ট্রের প্রচারযন্ত্রের
কাছে কোনও উত্তর নেই।
বই পোড়ানো থেকে বই নিষিদ্ধ করা: একই রাজনীতির ভিন্ন মুখ
বই পোড়ানোর দৃশ্য যতটা
নাটকীয়, বই নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া
অনেক সময় ততটাই নীরব। আগুনের ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হয়, ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়। কিন্তু একটি বই যখন গ্রন্থাগার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, কোনও প্রকাশক যখন ভয়ে একটি পাণ্ডুলিপি ছাপেন না, কিংবা কোনও শিক্ষক যখন নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করতে সাহস
পান না, তখন সেই দমন-পীড়নের ছবি সব
সময় দৃশ্যমান হয় না। এই দুই পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের লক্ষ্য কখনও কখনও
এক— চিন্তার স্বাধীন পরিসর সংকুচিত করা। বইয়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুধু লেখকের
বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়, পাঠকের নিজের
সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর অধিকারকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে।
তবে এখানে একটি সতর্কতা
প্রয়োজন। প্রতিটি বই নিষিদ্ধ করা, প্রতিটি গ্রন্থাগার
থেকে বই সরানো কিংবা প্রতিটি বই পোড়ানোর ঘটনাকে ফ্যাসিবাদ বলা যায় না। বিভিন্ন
সমাজে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, নৈতিক কিংবা নিরাপত্তাসংক্রান্ত নানা যুক্তিতে বই নিষিদ্ধ
হয়েছে। কোনও নির্দিষ্ট বইয়ের বিষয়ে আপত্তি থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্যাসিবাদের
প্রমাণ নয়। বরং দেখতে হবে, এই পদক্ষেপের
মাধ্যমে কোনও শাসক বা সংগঠন কি বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছে, কোনও জনগোষ্ঠীকে সমাজের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছে, অথবা স্বাধীন জ্ঞানচর্চার উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
করছে।
বই পোড়ানোর রাজনীতিকে বুঝতে
হলে তাই আগুনের দিকে তাকানোর পাশাপাশি দেখতে হবে, কে আগুন জ্বালাচ্ছে, কেন জ্বালাচ্ছে এবং
সেই আগুনের পরে কোন চিন্তাটি সমাজে অবশিষ্ট রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আগুনের বিরুদ্ধে বই: প্রতিরোধের ইতিহাস
বই পোড়ানোর ইতিহাসের আর একটি
দিক আছে। বই ধ্বংস করার চেষ্টা যেমন ক্ষমতার প্রকাশ, তেমনই বইকে রক্ষা করা হয়ে উঠতে পারে প্রতিরোধের কাজ। ১৯৩৩ সালের নাৎসি বই
পোড়ানোর পর আমেরিকায় বহু লেখক, সংবাদপত্র ও সংগঠন
প্রতিবাদ জানিয়েছিল। লেখিকা হেলেন কেলার জার্মান ছাত্রদের উদ্দেশে খোলা চিঠিতে
স্বাধীন চিন্তার পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর বইও নাৎসিদের আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছিল। একই
দিনে নিউ ইয়র্কে হাজার হাজার মানুষ জার্মানির ঘটনাবলির প্রতিবাদে সমাবেশ ও মিছিলে
অংশ নেন।
প্রতিরোধের অর্থ শুধু
নিষিদ্ধ বই লুকিয়ে রাখা নয়। তার অর্থ বইকে আবার পাঠকের কাছে ফিরিয়ে আনা, হারিয়ে যাওয়া লেখকের নাম পুনরুদ্ধার করা, মুছে দেওয়া ইতিহাসের দলিল সংরক্ষণ করা এবং পরবর্তী
প্রজন্মকে জানানো— কেন কোনও একটি বই একসময় এত ভয় তৈরি করেছিল। এই কারণেই
স্বৈরশাসনের অবসানের পরেও বই ও প্রকাশনার ইতিহাস পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্পেনের ফ্রাঙ্কো-পরবর্তী সমাজে সেন্সরশিপের প্রভাব নিয়ে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অতীতে সম্পাদিত বা পরিবর্তিত পাঠ পরবর্তী সময়েও প্রকাশনা ও
সাহিত্যচর্চাকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই তার সমস্ত ক্ষত
মুছে যায় না।
একটি ধ্বংস হওয়া বই পুনরায়
ছাপা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যে প্রজন্ম বইটি পড়ার সুযোগ পায়নি, যে পাঠক কোনও লেখকের নামই জানতে পারেনি, কিংবা যে সমাজ কোনও ঐতিহাসিক বিতর্কের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার
সুযোগ হারিয়েছে, তাদের কাছে সেই
ক্ষতি পৌঁছে দিতে সময় লাগে। বইয়ের দহন তাই শুধু বর্তমানের উপর আঘাত নয়; ভবিষ্যতের জ্ঞানচর্চার উপরও তার দীর্ঘ ছায়া পড়ে।
বইকে ভয় পায় যে ক্ষমতা
ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী
শাসনের বই পোড়ানোর সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক দ্বন্দ্বের কথা বলে। একদিকে
রয়েছে এমন ক্ষমতা, যা সমাজকে একটি
নির্দিষ্ট পরিচয়, একটি নির্দিষ্ট
ইতিহাস এবং একটি নির্দিষ্ট সত্যের মধ্যে আটকে রাখতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে বই— যা
মানুষকে একাধিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে, প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে শেখায়,
অপরের
অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করে এবং নিজের বিশ্বাসকে নতুন করে যাচাই করার সুযোগ দেয়। বইয়ের
শক্তি এই নয় যে প্রতিটি বই সত্য কথা বলে। বইয়ে ভুল থাকতে পারে, ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য থাকতে পারে, ইতিহাসের বিকৃতি থাকতে পারে। কিন্তু তার মোকাবিলা করার পথও
আছে— যুক্তি, গবেষণা, সমালোচনা, পাল্টা লেখা এবং
মুক্ত আলোচনা। বইয়ের বক্তব্যের উত্তর বইকে আগুনে ফেলে দেওয়া নয়। বরং তার বক্তব্যকে পরীক্ষা করার মতো একটি
স্বাধীন সমাজ গড়ে তোলা। নাৎসি জার্মানির অগ্নিকুণ্ড থেকে আর্জেন্তিনার ধ্বংস হওয়া
প্রকাশনা, চিলির নিষিদ্ধ বই থেকে
ফ্যাসিস্ট ইতালির নিয়ন্ত্রিত সাহিত্য— বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে
দেয়, ক্ষমতা যখন চিন্তার উপর
একচেটিয়া অধিকার দাবি করে, তখন বইয়ের স্বাধীনতা
রাজনৈতিক স্বাধীনতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
একটি বই পুড়িয়ে তার কাগজ
ধ্বংস করা যায়। তার প্রচ্ছদ, মলাট, ছাপা অক্ষর— সবই ছাই হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই বই যে
প্রশ্নটি তুলেছিল, তা সব সময় পুড়িয়ে
ফেলা যায় না। কখনও সেই প্রশ্ন অন্য কোনও বইয়ে ফিরে আসে, কখনও কোনও পাঠকের স্মৃতিতে, কখনও আবার পরবর্তী প্রজন্মের নতুন অনুসন্ধানে।
যে শাসক বই পোড়ায়, সে আসলে শুধু অতীতকে ধ্বংস করতে চায় না; ভবিষ্যৎ কী পড়বে,
কী
জানবে এবং কী প্রশ্ন করবে, সেই অধিকারটিও নিজের
হাতে তুলে নিতে চায়। আর বইকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম তাই শেষ পর্যন্ত মানুষের
স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম।
তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ
United States
Holocaust Memorial Museum — Nazi Book Burnings: ১৯৩৩ সালের জার্মানির বই
পোড়ানোর ইতিহাস ও রাজনৈতিক তাৎপর্য।
University of
Toronto Press — Censorship and Literature in Fascist Italy: মুসোলিনির ইতালিতে
সাহিত্য ও প্রকাশনার উপর নিয়ন্ত্রণ।
Biblioteca Nacional
de Chile — La crisis dramática
en la primera etapa del periodo militar: চিলির সামরিক শাসনে সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের
ইতিহাস।
আর্জেন্তিনার
নিষিদ্ধ বইয়ের সংগ্রহ — Biblioteca
de Libros Prohibidos: নিষিদ্ধ ও ধ্বংস হওয়া বইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ।
