Thursday, October 29, 2026

অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি: মানুষের ভয়, প্রত্যাশা, আস্থা

একজন মানুষের পকেটে টাকা আছে। তবু তিনি বাজারে যাচ্ছেন না। নতুন জামা কিনছেন না, ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা বাতিল করছেন, এমনকি পুরোনো স্কুটারটিও সারাচ্ছেন না। কেন? তিনি জেনে গিয়েছেন, তাঁর চাকরিটা হয়তো আগামী মাসে থাকবে না। অন্যদিকে, আর একজনের বেতন আগামী মাসে বাড়বে বলে খবর এসেছে। বেতন এখনও বাড়েনি, টাকা এখনও ব্যাঙ্কে ঢোকেনি। তবু তিনি নতুন ফোন কেনার কথা ভাবছেন, পরিবারের জন্য বাড়তি খরচ করছেন। কারণ, তাঁর মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় নয়, প্রত্যাশা কাজ করছে। দু’জনের পকেটের অঙ্ক আলাদা হতে পারে। কিন্তু আসল তফাতটা টাকার অঙ্কে নয়, আগামীকাল সম্পর্কে তাঁদের ধারণায়। অর্থনীতির গতিপথ অনেক সময় ঠিক করে দেয় সেই আগামীকাল, যা এখনও আসেইনি। এই সহজ অথচ গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে নতুন করে সামনে এনেছে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী রবার্ট হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা।

মানুষের প্রত্যাশা কীভাবে আজকের খরচ, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং বাজারের গতিপথ বদলে দেয়, আধুনিক অর্থনীতির আলোচনায় তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিষয়টি শুনতে অর্থনীতির বইয়ের কঠিন তত্ত্ব বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে আমাদের রান্নাঘরে, বাজারের থলিতে, ব্যাঙ্কের ঋণে, এমনকি চাকরি থাকবে কি না— সেই দুশ্চিন্তাতেও। আর ভারতের মতো দেশে, যেখানে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন আয় ও খরচের হিসাব মেলাতে লড়াই করেন, সেখানে এই প্রশ্ন আরও জরুরি।

একসময় অর্থনীতির একটি জনপ্রিয় ধারণা ছিল, বাজারকে নিজের নিয়মে চলতে দিলে সে নিজেই ভারসাম্য খুঁজে নেবে। অষ্টাদশ শতকের অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের সঙ্গে এই ধারণার নাম জড়িয়ে আছে। ক্রেতা নিজের স্বার্থ দেখবেন, বিক্রেতা নিজের লাভের কথা ভাববেন, আর তাঁদের পারস্পরিক লেনদেনের মধ্য দিয়েই বাজারের ব্যবস্থা তৈরি হবে।

কিন্তু ইতিহাস সব সময় তত্ত্বের কথা শোনে না। ১৯২৯ সালে আমেরিকায় শুরু হল ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়। শেয়ারবাজারে ধস নামল। ব্যবসা বন্ধ হতে লাগল। লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারালেন। মানুষের আয় কমল, কেনাকাটা কমল, ব্যবসায়ীদের বিক্রিও কমে গেল। ব্যবসা বাঁচাতে আরও কর্মী ছাঁটাই হলেন। আবার কমল মানুষের আয়। একটি ভয় কীভাবে আর একটি ভয়কে জন্ম দেয়, তার যেন এক ভয়ংকর উদাহরণ হয়ে উঠল সেই মহামন্দা।

তখন অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্‌স বললেন, বাজারের উপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিলে চলবে না। মানুষ যখন খরচ করতে ভয় পাচ্ছেন, ব্যবসায়ীরা যখন বিনিয়োগ করতে চাইছেন না, তখন সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে, প্রয়োজনমতো কর কমাতে হবে, অর্থনীতিতে চাহিদা ফিরিয়ে আনতে হবে। যুক্তিটা সহজ। মানুষের হাতে টাকা থাকলে তাঁরা কিনবেন। মানুষ কিনলে ব্যবসায়ীদের বিক্রি বাড়বে। বিক্রি বাড়লে উৎপাদন বাড়তে পারে, নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতির চাকা আবার ঘুরতে শুরু করবে।

কিন্তু সমস্যার এখানেই শেষ নয়। সত্তরের দশকে বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দেখা দিল আর এক বিপদ—‘স্ট্যাগফ্লেশন’। একদিকে জিনিসের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে বেকারত্বও। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের তেলসংকট দেখিয়ে দিল, উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলেও মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। মানুষ কম কিনছেন বলেই যে দাম কমবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। পরিবহন খরচ বাড়লে খাবার থেকে পোশাক—বহু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তখন শুধু সুদের হার কমানো বা বাড়ানো দিয়ে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না। অর্থনীতির সামনে তখন আরও বড় প্রশ্ন এসে দাঁড়াল: মানুষের সিদ্ধান্ত, ভয়, আশা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণাকে বাদ দিয়ে কি অর্থনীতিকে সত্যিই বোঝা সম্ভব?

ভবিষ্যৎ খারাপ হবে— এই ভয় কখনও কখনও ভবিষ্যৎকে সত্যিই আরও খারাপ করে তোলে। ধরুন একটি সাধারণ ভারতীয় পরিবারের কথা। মাসে আয় ত্রিশ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া, চাল-ডাল, রান্নার গ্যাস, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত এবং ওষুধের খরচ মেটাতে মাসের শেষ দিকে হাতে বিশেষ কিছু থাকে না। একদিন পরিবারের উপার্জনকারী শুনলেন, তাঁর কর্মস্থলে ছাঁটাই হতে পারে। খবরটি এখনও নিশ্চিত নয়। তাঁর বেতনও কমেনি। তবুও পরের দিন থেকেই হিসাব বদলে গেল। নতুন জামা কেনা বন্ধ। বাইরে খাওয়া বন্ধ। বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল। হাতে যা আছে, তার যতটা সম্ভব সঞ্চয় করে রাখতে হবে। এ বার ভাবুন, এমন সিদ্ধান্ত যদি একটি পরিবার নয়, লক্ষ লক্ষ পরিবার নেয়?

দোকানে ক্রেতা কমবে। বিক্রি কমলে দোকানদার কম পণ্য কিনবেন। পাইকারের বিক্রি কমবে। কারখানায় উৎপাদন কমতে পারে। উৎপাদন কমলে আরও কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হবে। একটি পরিবারের ভয় তখন আর শুধু সেই পরিবারের মধ্যে আটকে থাকে না। তা ছড়িয়ে পড়ে বাজারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এখানেই অর্থনীতির আসল নাটক। কোনও বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই বিপর্যয়ের আশঙ্কা মানুষের আচরণ বদলে দিতে পারে। আর বহু মানুষের সেই বদলে যাওয়া আচরণ মিলেই কখনও কখনও সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।

বাজারের আর একটি দৃশ্য আরও পরিচিত। খবর ছড়িয়েছে, আগামী সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম বাড়বে। কেউ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পেঁয়াজ কিনে রাখছেন। কেউ চাল-ডাল মজুত করছেন। ব্যবসায়ীরাও ভাবছেন, এই সুযোগে দাম বাড়ানো ভালো। ফলে দাম বাড়ার আশঙ্কা থেকেই বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। অবশ্য সব মূল্যবৃদ্ধির কারণ মানুষের প্রত্যাশা নয়। ফসল নষ্ট হলে, আমদানির খরচ বাড়লে, পরিবহনে সমস্যা হলে কিংবা সরবরাহ কমে গেলে দাম বাস্তব কারণেও বাড়ে। কিন্তু ভবিষ্যতে দাম বাড়বে— এই বিশ্বাস কখনও সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? শুধু ঘোষণা করলেই হবে না, কেন দাম বাড়ছে, সেটাও নিরপেক্ষভাবে বুঝতে হবে। জনগণকে জানাতে হবে।

মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা আর সরকারি বক্তব্যের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকলে বিশ্বাস কমে যায়। আর একবার বিশ্বাস নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। আজ সরকার বলছে, অর্থনীতি ভালো চলছে। কাল বলছে, পরিস্থিতি সামলাতে আরও সময় লাগবে। একদিকে নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বেগ। একদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে অনিয়মের অভিযোগে নীরবতা। এই বৈপরীত্য মানুষের মনে প্রশ্ন তোলে। নিয়ম কি সত্যিই সবার জন্য সমান? বিনিয়োগ করলে নিয়মের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে তো? আজ যে নীতি রয়েছে, কালও কি তা থাকবে? ব্যবসায়ীর কাছে এই প্রশ্নগুলি নিছক রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এগুলি তাঁর লাভ-ক্ষতির হিসাবের অংশ। তিনি যদি মনে করেন, আগামীকাল নিয়ম বদলে যেতে পারে, তাহলে আজই বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে আসতে পারেন। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পথও সংকুচিত হয়। রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা তাই শুধু ভোটের বিষয় নয়। তা দেশের অর্থনীতিরও প্রশ্ন।

একটি দেশের সরকার মানুষের কাছে আস্থা চাইতেই পারে। কিন্তু সেই আস্থা তৈরি হবে কীভাবে? শুধু বক্তৃতায়? বিজ্ঞাপনে? বড় বড় প্রতিশ্রুতিতে? না। আস্থা তৈরি হয় কাজে। সরকারকে জানাতে হবে, মূল্যবৃদ্ধি কেন হচ্ছে এবং তা কমাতে কী করা হচ্ছে। কোনও সিদ্ধান্ত ভুল হলে তা স্বীকার করতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতাও জরুরি। ব্যবসায়ীরা যেন বুঝতে পারেন, কর, ঋণ, আমদানি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের নিয়ম কীভাবে কাজ করবে। পরিস্থিতি বদলালে নীতিও বদলাতে পারে। কিন্তু কেন বদলানো হচ্ছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার। যে ব্যবস্থায় প্রশ্ন করা যায় না, ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায় না, সেখানে অন্ধ আনুগত্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু সুস্থ অর্থনীতির জন্য দরকার যুক্তিসংগত আস্থা— যে আস্থা প্রমাণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির উপর দাঁড়িয়ে থাকে।

ভারতের অর্থনীতির সামনে তাই প্রশ্নটা শুধু কতটা বৃদ্ধি হল, কত টাকা বিনিয়োগ এল কিংবা মূল্যস্ফীতি কত শতাংশ— সেখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন হল, সেই বৃদ্ধির সুফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছচ্ছে? নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে কি? পরিবারের আয় কি নিয়মিত বাড়ছে? নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কি আরও কঠিন হয়ে উঠছে? ব্যবসায়ীরা কি আগামী কয়েক বছরের পরিকল্পনা করতে পারছেন? সাধারণ মানুষ কি বিশ্বাস করছেন, আজ পরিশ্রম করলে আগামীকাল তার ফল পাবেন? সবচেয়ে বড় কথা, মানুষকে শুধু আশাবাদী হতে বললে চলবে না। আশাবাদী হওয়ার মতো বাস্তব কারণও তৈরি করতে হবে।

কারণ, যে শ্রমিক জানেন না আগামী মাসে কাজ থাকবে কি না, যে ছোট ব্যবসায়ী জানেন না আগামীকাল তাঁর খরচ কত বাড়বে, যে পরিবার জানে না অসুস্থ হলে চিকিৎসার টাকা কোথা থেকে আসবে— তাঁদের কাছে ভবিষ্যতের আশ্বাসের চেয়ে বর্তমানের নিশ্চয়তা অনেক বেশি জরুরি। অর্থনীতি তখনই এগোয়, যখন মানুষ শুধু আজকের হিসাব মেলান না, আগামীকালের জন্যও পরিকল্পনা করতে পারেন।

আর যে দেশের মানুষ আগামীকালকে বিশ্বাস করতে পারেন না, সেই দেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকেই যায়— বৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ কি সত্যিই ভবিষ্যতের দিকে এগোতে সাহস পাচ্ছেন?