মোদি-রাজত্বে সবচেয়ে বড় সঙ্কট?
সঙ্কট
সামলাতে জানেন নরেন্দ্র মোদি। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে কীভাবে নিজের পক্ষে কাজে
লাগাতে হয়, তার
প্রমাণ রেখেছেন বারেবারে।
২০০১ সালে
গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর থেকে আজ প্রধানমন্ত্রী— গত ২৫ বছরে একের
পর এক রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়েছেন। কখনও গুজরাত দাঙ্গা, কখনও অমিত
শাহের গ্রেপ্তারি, কখনও
নোটবন্দি, কখনও
কোভিডের বিপর্যয়, কখনও
কৃষক আন্দোলন। প্রতিবারই বিরোধীদের আক্রমণ সামলে ফিরে এসেছেন। কখনও রাজনৈতিক ক্ষতি
মেরামত করে, কখনও আরও শক্তিশালী হয়ে। কিন্তু এবারের সঙ্কট অন্য রকম!
এই সঙ্কট
শুধু মোদির জনপ্রিয়তা,
সরকারের ব্যর্থতা কিংবা বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নয়। প্রশ্ন উঠছে সেই
প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে, যার উপর দাঁড়িয়ে ভারতীয়
গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার— ভোট! ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ
কুমারকে ঘিরে বিতর্ক নিছক একজন সাংবিধানিক পদাধিকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা
নয়। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হলে তার অভিঘাত
কোনও একটি নির্বাচন বা কোনও একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আটকে থাকে না। আঘাত লাগে
গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর। এখানেই মোদি সরকারের অস্বস্তির কারণ।
প্রধানমন্ত্রী
হওয়ার পর তাঁর সামনে বিপদ কম আসেনি। নোটবন্দির সিদ্ধান্তে অর্থনীতি ও সাধারণ
মানুষের জীবন নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। জিএসটি চালু করাও সহজ ছিল না। উরি
ও পুলওয়ামা হামলার পর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে
জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচার তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত
বিজেপি ২০১৪ সালের চেয়েও বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফেরে। ২০২৪ সালের লোকসভা
নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। সরকার গড়তে জোটসঙ্গীদের উপর নির্ভর
করতে হয়। তবু পরবর্তী সময়ে জোট সরকার পরিচালনা এবং নিজের নেতৃত্বের কর্তৃত্ব
বজায় রাখার ক্ষেত্রে মোদি এমন কোনও প্রকাশ্য দুর্বলতা দেখাননি, যাতে তাঁর
রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়।
আসলে মোদি
সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের একটি পরিচিত দিক হল— বিতর্কের কেন্দ্রে না থেকে সময়কে
নিজের পক্ষে কাজে লাগানো। তীব্র সমালোচনা কিছুদিন চলুক, সংবাদমাধ্যমে
নতুন ঘটনা আসুক, বিরোধীদের
মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরুক— তারপর ধীরে ধীরে পুরনো বিতর্কের তীব্রতা কমে যাবে। এই
কৌশল অতীতে বহুবার কার্যকর হয়েছে। গুজরাত দাঙ্গার পর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন, নোটবন্দির
ধাক্কা সামলে নির্বাচনী সাফল্য, কৃষক আন্দোলনের পরে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার— প্রতিটি
ক্ষেত্রের বাস্তবতা অবশ্য আলাদা। কিন্তু মোদির কৌশল ছিল পরিস্থিতি বুঝে পিছিয়ে
আসা, আক্রমণাত্মক
হওয়া অথবা নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা। এত দিন পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক সাফল্যের
মূল রহস্য ছিল এটাই।
এত দিন
বিরোধীরা অভিযোগ তুললে সরকার সহজেই বলতে পারত, এসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বিরোধীরা ক্ষমতায় ফিরতে চায়, তাই নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করছে। কিন্তু অভিযোগের সূত্র
যখন নির্বাচন কমিশনের অন্দরেও পৌঁছয়, তখন সেই যুক্তি দিয়ে সব প্রশ্ন
থামিয়ে দেওয়া কঠিন। এবার প্রশ্ন শুধু নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্ন
উঠছে, এই
কমিশনকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক দায় কার?
নির্বাচন
কমিশনের কাজ সরকারকে স্বস্তি দেওয়া নয়। বিরোধীদের খুশি রাখাও নয়। তার কাজ—
ক্ষমতাসীন দলসহ প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান ময়দান নিশ্চিত করা। এই
নিরপেক্ষতা শুধু কমিশন ঘোষণা করলে চলে না, তার কাজকর্মেও প্রমাণ থাকতে হয়।
কিন্তু কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি বদল, নিয়োগের নির্বাচকমণ্ডলী থেকে
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া এবং সেখানে সরকারের আর এক
প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে। সমালোচকদের
আশঙ্কা, এর
ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব বেড়েছে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—
যে প্রতিষ্ঠানের সরকারের উপর নজর রাখার কথা, সেই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে
নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব কতটা থাকা উচিত?
ভোটার
তালিকা নির্ভুল রাখা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া, মৃত
ভোটারের নাম সরানো কিংবা যোগ্য ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা— এসব কাজে
আপত্তির কারণ নেই। বরং স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত।
কিন্তু সেই কাজের পদ্ধতি যদি বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে, যদি বৈধ
ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, যদি নোটিস ও শুনানির প্রক্রিয়া
মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, তা হলে কমিশনকে আরও বেশি স্বচ্ছ হওয়া উচিত। একজন প্রকৃত
ভোটারের কাছে ভোটাধিকার কেবল কাগজে লেখা কোনও অধিকার নয়। এটি নাগরিক হিসেবে তাঁর
অস্তিত্বের স্বীকৃতি। তালিকায় নাম না থাকলে সেই অধিকার প্রয়োগের সুযোগই হারিয়ে
যেতে পারে। তাই ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে একজন যোগ্য নাগরিকও যাতে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত
করা কমিশনের দায়িত্ব। প্রশ্ন হল, এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ভুলের সম্ভাবনা কতটা, সেই ভুল
শনাক্ত ও সংশোধনের ব্যবস্থা কী এবং সাধারণ মানুষ কত সহজে নিজেদের অধিকার রক্ষা
করতে পারবেন? কমিশন
যদি এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর দিত, বিতর্ক অনেকটাই মিটে যেত। কিন্তু
নীরবতা সন্দেহ বাড়িয়েছে।
এর সঙ্গে
যুক্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনারদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে বিতর্ক। তাঁদের সরকারি
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দেওয়া সুরক্ষার পরিধি কতটা বিস্তৃত, তা নিয়েও
প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের যুক্তি, এই ধরনের সুরক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কমিশনারদের
স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া, যাতে রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিশোধের ভয় তাঁদের সিদ্ধান্তকে
প্রভাবিত না করে। কিন্তু সেই সুরক্ষা যদি জবাবদিহি এড়ানোর ঢাল হয়ে ওঠে, তা হলে তার
অপব্যবহারের আশঙ্কাও থেকে যায়। প্রশ্ন তাই একটাই— সুরক্ষা কাকে দেওয়া হচ্ছে, কেন দেওয়া
হচ্ছে এবং সেই সুরক্ষার সীমা কোথায়? এই প্রশ্নগুলির জবাব দেওয়া সরকারের
দায়িত্ব। কারণ, নির্বাচন
কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি
ক্ষতিগ্রস্ত হয় না,
গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থাও নড়ে যায়।
জ্ঞানেশ
কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে লাভ নেই। আসল প্রশ্ন, এরপর কী
হবে? জ্ঞানেশ
কি নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন? তেমন কোনও লক্ষণ নেই। তিনি হয়তো মনে করেন, পদত্যাগ
করলে বিরোধীদের অভিযোগই সত্য বলে প্রমাণিত হবে। আবার সরকারও তাঁকে সরাতে চাইবে কি
না, তা
নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, জ্ঞানেশকে সরানোর সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক অর্থ হবে অনেক বড়।
সরকার তাঁকে সরালে বিরোধীরা বলতে পারে, তাদের অভিযোগের চাপে
প্রধানমন্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে
প্রশ্নের মুখে সরকার নিজের পছন্দের ব্যক্তিকেও আর রক্ষা করতে পারছে না। অন্য দিকে, তাঁকে পদে
রেখে দিলে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। প্রতিটি নির্বাচন, প্রতিটি
ভোটার তালিকা সংশোধন,
প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে জ্ঞানেশের নাম জড়িয়ে যাবে। তখন কোনও
ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নতুন করে আলোচনায়
আসবে।
এই বিতর্কে
বিজেপি সরাসরি কতটা নির্বাচনী ক্ষতির মুখে পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে
সন্দেহ যত বাড়বে, নির্বাচনের
ফল নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কাও তত বাড়বে। নরেন্দ্র মোদি গত ২৫ বছরে বহু
রাজনৈতিক ঝড় সামলেছেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা আর প্রতিষ্ঠানগুলির উপর মানুষের
বিশ্বাস ধরে রাখা এক জিনিস নয়। এই কারণেই জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্ককে শুধু
মোদি-বিরোধী রাজনীতির আর একটি অধ্যায় হিসেবে দেখা ভুল হবে। আসল প্রশ্ন, একজন
ব্যক্তি বা একটি দলের চেয়েও বড় ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা কি এমন আস্থা ধরে রাখতে
পারছে, যাতে
পরাজিত দলও ফল মেনে নিতে পারে এবং বিজয়ী দলও নিজের জয়কে প্রশ্নাতীত বলে দাবি না
করে?
বহুবার
মোদি রাজনৈতিক লড়াইকে ‘দেশপ্রেম বনাম দেশবিরোধিতা’, ‘জাতীয়তাবাদ বনাম বিচ্ছিন্নতাবাদ’
কিংবা ‘ভারত বনাম পাকিস্তান’—এই ধরনের দ্বন্দ্বের কাঠামোয় তুলে ধরেছেন। এতে মূল
রাজনৈতিক প্রশ্ন থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে পরিচয় ও আবেগের প্রশ্নকে সামনে আনা
সম্ভব হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই কৌশল
কতটা কার্যকর হবে? এই
রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রশ্ন শুধু কে সরকার চালাবে, তা নয়। প্রশ্ন হল, মানুষ কি
বিশ্বাস করবেন যে তাঁদের ভোটের মূল্য রয়েছে? তাঁরা কি মনে করবেন, তাঁদের
ভোটের ভিত্তিতেই সরকার তৈরি হচ্ছে? আর সেই বিশ্বাস রক্ষা করার
দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটির উপর তাঁরা আস্থা রাখতে পারবেন?
যে নাগরিক
জানতে চাইছেন তাঁর নাম ভোটার তালিকায় থাকবে কি না, তাঁকে বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বলে
কতটা আশ্বস্ত করা যাবে?
যে তরুণ জানতে চাইছেন,
দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি স্বাধীনভাবে কাজ করছে কি না, তাঁর
প্রশ্নের উত্তর কি শুধু দেশপ্রেমের বক্তৃতা দিয়ে দেওয়া সম্ভব? এটাই মোদি
সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। সম্ভবত এটাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড়
পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষার ফল শুধু জ্ঞানেশ কুমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। তার
সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, ২০২৭ সালের
উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন এবং ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে মোদি সরকারের রাজনৈতিক
ভবিষ্যৎও।
গণতন্ত্রের
সঙ্কট শুরু হয় তখনই,
যখন মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার প্রয়োগের আগেই নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর বিশ্বাস
হারাতে শুরু করে!

No comments:
Post a Comment