Friday, October 9, 2026

কাশ্মীর: জেহাদের কানাগলি

কাশ্মীর: জেহাদের কানাগলি

শ্রীনগরের ডাল লেকের উপর, শঙ্করাচার্য পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত একটি ছোটো, সাধারণ দু’তলা বাড়ি। বিশাল এক চিনার গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়িটির গায়ে অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। হাতে খোদাই করা আখরোট কাঠের নকশাদার ছাদগুলি যেন হাসপাতালের দেওয়ালের মতো সাদা এনামেল রঙে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এর ডান পাশে রয়েছে অত্যন্ত বেমানান একটি কংক্রিটের অফিস। সরকারি দপ্তরের যথেষ্ট প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাড়িটার স্বাভাবিক সৌন্দর্য পুরোপুরি আড়াল করা সম্ভব হয়নি। এই বাড়িতেই নাকি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর মধুচন্দ্রিমার কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন। যদিও এই কাহিনি কতটা সত্য তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তবু যাঁরা বাড়িটি দেখেছেন তাঁদের এ কথা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। এই বাড়িটির চারপাশেই ছড়িয়ে আছে জম্মু ও কাশ্মীরের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। বাড়িটির বাঁ দিকে কয়েকশো মিটার দূরে শেখ মহম্মদ আবদুল্লার বাংলো। রাস্তার অপর পাশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পঞ্চদশ কোর-এর লেফটেন্যান্ট জেনারেলের অফিস ও বাসভবন। এই বাহিনী ১৯৪৭–৪৮ সালে পাকিস্তানের হাত থেকে জম্মু ও কাশ্মীরকে রক্ষা করেছিল এবং সেই অঞ্চল তখন থেকে তাদেরই নিয়ন্ত্রণে।

ক্ষমতার আরও নানা কেন্দ্র ছড়িয়ে আছে এই এলাকার চারদিকে। জম্মু ও কাশ্মীরে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ প্রতিনিধির সরকারি বাসভবন। গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র)-এর প্রধানের বাসভবন। রয়েছে পরিমহল, যা একসময় শ্রীনগরের বহু প্রভাবশালী আমলার আবাসস্থল ছিল এবং একইসঙ্গে এই বাড়ি অত্যন্ত গোপন জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষমতার ভৌগোলিক বিন্যাস নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁদের কাছে পাহাড়চূড়ার এই বাড়িটির অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখান থেকে এই সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পৌঁছাতে হলে সামান্য ঢাল বেয়ে নীচে হেঁটে যেতে হবে। উলটোভাবে, এইসব প্রতিষ্ঠানের কাউকে যদি ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর বাসভবনে যেতে হয়, তবে তাঁদের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে হয়।

এই বই সেই পাহাড়চূড়ার বাড়িটিকে ঘিরে আবর্তিত গোপন ঝড়ের ইতিহাস। অর্থাৎ ১৯৪৭–৪৮ সাল থেকে জম্মু ও কাশ্মীরের দীর্ঘস্থায়ী জেহাদের ইতিহাস! ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের মর্মান্তিক ঘটনাবলি এবং তার পরবর্তী সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্ব-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এর ফলে আমরা এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আক্রমণের পর সেখানকার ঘটনাবলিকে ইসলামপন্থী উগ্র ডানপন্থার সূচিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বোঝার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখা হয়।

আধুনিক ইসলামপন্থী সংগঠনসমূহ নিয়ে রচিত বহু গবেষণায় তাদের উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলির ব্যর্থ ইতিহাসের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো, দারিদ্র্য, দমনমূলক শাসনব্যবস্থা এবং এর ফলে জনগণের ক্ষোভ ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়াকেই এসব সংগঠনের উত্থানের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই ব্যাখ্যায় ইসলামপন্থী সন্ত্রাসবাদকে জাতিরাষ্ট্র গঠনের ব্যর্থতার পরিণতি হিসেবে দেখা হয়। আর এর রাজনৈতিক ভিত্তিকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রব্যবস্থার বাইরে এবং তার বিরোধী এক ধরনের বয়ান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরের জেহাদ এই ভাবনার প্রায় সবকটিকেই চ্যালেঞ্জ জানায়। এই জেহাদের উৎপত্তি বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় প্রান্তিকে তথাকথিত মুসলিম বিশ্বে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাবলির ফল নয়। বরং এটি শুরু হয় ১৯৪৭ সালে— ভারত ও পাকিস্তানের জন্মের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে। ইরানি বিপ্লব কিংবা সোভিয়েত বাহিনীর আমু দরিয়া অতিক্রম করে আফগানিস্তানে প্রবেশের বহু দশক আগে।

এই জেহাদ ছিল আধুনিক দু’টি জাতিরাষ্ট্র— ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টিরই এক প্রত্যক্ষ ফল। দীর্ঘ জেহাদের অধিকাংশ প্রধান নেতা কিংবা অংশগ্রহণকারীরা ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁদের কর্মকাণ্ডে দুই দেশের সামরিক ও গোপন গোয়েন্দা সংস্থা, ভূ-কৌশলগত স্বার্থ, আদর্শগত উদ্বেগ এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বসংক্রান্ত নিরাপত্তা-আশঙ্কা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

১৯৯০ সাল থেকে, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের সংঘাত আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে শুরু করে, তখন থেকেই বহু গ্রন্থ এই হিংসার রাজনৈতিক কারণ বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছে। যেমন, ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড-এর ‘Kashmir in Conflict’ গ্রন্থে ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে বিরোধের ঐতিহাসিক শিকড় এবং সেই রাজনৈতিক শক্তিগুলির উৎপত্তির একটি চমৎকার বিশ্লেষণ রয়েছে, যারা একসময় ভারতের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে ভারতকে উৎখাত করার হুমকি সৃষ্টি করেছিল। অন্যদিকে সুমিত গাঙ্গুলি তাঁর ‘The Crisis in Kashmir’ গ্রন্থে স্বাধীনতার পর নতুন সামাজিক শক্তি এবং দুর্বল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংঘর্ষ কীভাবে ১৯৯০ সালের হিংসার বিস্ফোরণের ভিত্তি তৈরি করেছিল, তার একটি তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। নবনীতা চাড্ডা-বেহেরা আবার জম্মু ও কাশ্মীরে জাতিগত পরিচয় ও আঞ্চলিক পরিচয়কে ঘিরে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্বগুলি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

এসব গ্রন্থ চলমান সংঘাতের উৎস ও কাঠামো নিয়ে রচিত বিপুল মানসম্পন্ন গবেষণার মাত্র অল্প কয়েকটি উদাহরণ। তবে এদের অধিকাংশই জম্মু ও কাশ্মীরের হিংসাকে তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভূত একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে।

যেমন ধরুন, মহম্মদ আমির রানা যুক্তি দিয়েছেন, আধুনিক পাকিস্তানি ‘জেহাদ সংস্কৃতি’ ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শক্তিশালী হয়েছিল। আমেরিকার অপারেশন সাইক্লোন (Operation Cyclone)-এর মাধ্যমে লালিত-পালিত হয়েছিল। ওসামা বিন লাদেনের চরমপন্থী মতাদর্শ ও অর্থায়নে পুষ্টি লাভ করেছিল। এবং শেষ পর্যন্ত তালিবানের কর্মকাণ্ডে তার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। এই যুক্তির কিছু ভিত্তি অবশ্যই রয়েছে। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ায় সংঘটিত যুগান্তকারী পরিবর্তনগুলি কাশ্মীরের জেহাদের তীব্রতা, চরিত্র এবং জনসমর্থনকে নিঃসন্দেহে গভীরভাবে রূপান্তরিত করেছিল। তবে এটিই পুরো ইতিহাস নয়।

বাস্তবে, ১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই সেখানে জেহাদ চলতে শুরু করে। পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণ থেকে রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন শ্রীনগরে অবতরণ করে, তখন থেকেই এই সংঘাতের সূচনা ঘটে। যদিও বহু গবেষণায় কাশ্মীরের ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি এবং ১৯৮৯–৯০ সালের ঘটনাবলির মধ্যবর্তী বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু সেই দীর্ঘ সময়ে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তার ধারাবাহিক ইতিহাস এখনও খুব কমই লেখা হয়েছে।

এই বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তান— উভয় দেশেরই দীর্ঘদিন নীরব থাকার নিজস্ব কারণ ছিল। ভারত শুরু থেকেই জম্মু ও কাশ্মীরে তার শাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ ছিল, তার গভীরতা ও ব্যাপকতা স্বীকার করতে চায়নি। অন্যদিকে, পাকিস্তানও প্রায় ছয় দশক ধরে সন্ত্রাসবাদকে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করার বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করতে আগ্রহী ছিল না। যা সম্ভবত যেকোনো সময়ে এবং যেকোনো দু’টি জাতিরাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। সংরক্ষিত সরকারি নথিপত্রের (আর্কাইভ) চরম অভাবের কারণে জম্মু ও কাশ্মীরের এই দীর্ঘ জেহাদের ইতিহাস যেন কেবল গবেষণাগ্রন্থের পাদটীকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

মূলত, এই বইটি জম্মু ও কাশ্মীরের ইতিহাসের একটি নতুন মানচিত্র উপস্থাপন করে। যেখানে ঘটনাপ্রবাহকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে এবং কেন্দ্রে রাখা হয়েছে জেহাদ ও তার পরিকল্পনাকারীদের। বইটিতে দীর্ঘ জেহাদের ইতিহাসকে কয়েকটি পৃথক পর্যায়ে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই বই শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক প্রবীণ স্বামীর লেখা ‘INDIA, PAKISTAN AND THE SECRET JIHAD’-এর উপর ভিত্তি করে লেখা। কাশ্মীরের রক্তাক্ত হওয়ার ইতিহাস চর্চায় সাংবাদিক প্রবীণ স্বামীর এই বই আকরগ্রন্থ।

প্রথম পর্যায় শুরু হয় ১৯৪৭–৪৮ সালের যুদ্ধের মাধ্যমে এবং ১৯৬০-এর দশকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময় পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট ছোটো ছোটো গোপন অভিযানকারী দল সক্রিয় ছিল, যাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা। জওহরলাল নেহরু যথার্থভাবেই এই সংঘাতকে ‘অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত জেহাদের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়, যা আরও সংগঠিত ও গতিশীল রূপ লাভ করে। এই পর্যায়ের নেতৃত্ব দেয় ‘মাস্টার সেল’ নামে পরিচিত একটি গোপন সংগঠন এবং এর অধীনস্থ অন্যান্য গোপন নেটওয়ার্ক। তাদের লক্ষ্য ছিল জম্মু ও কাশ্মীরে একটি ব্যাপক গণবিদ্রোহের পরিবেশ সৃষ্টি করা। তাদের কর্মকাণ্ড একদিকে ইসলামি জেহাদের সুস্পষ্ট আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল, অন্যদিকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর উদীয়মান অপ্রচলিত যুদ্ধনীতি-র ধারণার উপরও ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা মাস্টার সেলকে ধ্বংস করে দেওয়ার পর, তার ব্যর্থতা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা জেহাদের তৃতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়। এই পর্যায়ের প্রধান সংগঠন ছিল আল-ফাতাহ, যা ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।

আল-ফাতাহও তার পূর্বসূরিদের মতোই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। তবে তাদের পূর্বসূরিদের মতোই তারা এমন একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী তৈরি করতে সক্ষম হয়, যারা গোপন যুদ্ধের কৌশল ও প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত ছিল এবং ভবিষ্যতে পরামর্শদাতা ও অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আল-ফাতাহ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত হওয়ার (অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার) পর দীর্ঘ জেহাদ পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট। যদিও পাকিস্তানের গোপন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির কাছে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য ছিল না, তবুও তারা দীর্ঘ জেহাদের চতুর্থ পর্যায় কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে ভূ-কৌশলগত পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সাফল্যের আগে পর্যন্ত তারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে খুব বেশি প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পায়নি।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি দীর্ঘ জেহাদকে এক অভূতপূর্ব মাত্রায় উন্নীত করার সুযোগ সৃষ্টি করে। জেহাদের পঞ্চম পর্যায়ের বড়ো অংশ জম্মু ও কাশ্মীরের ভিতরে নয়, বরং বাইরের বিভিন্ন রণাঙ্গনে সংঘটিত হয়— যাকে সাংবাদিক প্রবীণ স্বামী ‘বহু ফ্রন্টের যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই পঞ্চম পর্যায়ই শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯–৯০ সালের ঘটনাবলির দিকে নিয়ে যায়— অর্থাৎ পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিরক্ষামূলক ছায়ায় পরিচালিত এক অপ্রচলিত যুদ্ধ।

ভারত–পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে বহু বিশ্লেষক রূপক অর্থে একে ‘অবিরাম’ বা ‘অন্তহীন’ সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই বইয়ের বর্ণনাটি কেবল রূপক নয়, আক্ষরিক অর্থেও সত্য। ১৯৪৭–৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং ১৯৯৯ সালের চারটি ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ এবং আরও কয়েকটি গুরুতর সংকট— যেগুলি প্রায় নতুন যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি যুদ্ধই ছিল এমন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, তা যেমন দীর্ঘ জেহাদের গতিপথ নির্ধারণ করেছে, তেমনই জেহাদের ধারাবাহিক বিকাশও সেই যুদ্ধগুলির গতিধারাকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু এই যুদ্ধগুলির মধ্যবর্তী সময়ে প্রকৃত অর্থে কোনো শান্তি ছিল না। যদিও জেহাদ পরিচালনা করত অল্পসংখ্যক গোপন অভিযানের সদস্য এবং তাদের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের পরিসর আজকের মানদণ্ডে তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবুও তাদের প্রভাব রাজনৈতিক জীবন ও নীতিনির্ধারণের উপর ছিল অত্যন্ত গভীর।

এই বইয়ে যেমন স্পষ্ট হয়ে উঠবে, দীর্ঘ জেহাদের প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু অংশগ্রহণকারী পরবর্তীকালে ১৯৮৯–৯০ সালের ঘটনাবলিতেও প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নিঃসন্দেহে, জেহাদের বাইরেও আরও অনেক বৃহত্তর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আদর্শগত শক্তি সেই বিস্ফোরক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিল। তবে এই বইয়ের উদ্দেশ্য হল সেই ইতিহাসের একটি উপেক্ষিত ধারাকে সামনে নিয়ে আসা এবং দেখানো যে, দীর্ঘ জেহাদ সেই বৃহত্তর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলিত অংশ। যা কাশ্মীরকে দিনের পর দিন শুধুই রক্তাক্ত করেছে। ধ্বংস করেছে সেখানকার মানুষের স্বাভাবিক জীবন।